Bangla Panjika 2026

✨ পবিত্র মুখোপাধ্যায় : মহাকাব্যিক সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল নাম

পবিত্র মুখোপাধ্যায় ( ১২ ডিসেম্বর, ১৯৪০ – ৯ এপ্রিল, ২০২১ ) ছিলেন বিগত শতকের ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যে মহাকবিতা তথা দীর্ঘ কবিতার ধারায় এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর সৃষ্টিশীলতা তাঁকে এনে দিয়েছিল কৃতি বাঙালি কবির পরিচিতি। তিনি কেবল কবিতা রচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, দীর্ঘদিন ধরে কবিতা বিষয়ক পত্রিকা ‘কবিপত্র’ সম্পাদনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে এক অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলা কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জীবন ও বেড়ে ওঠা

কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার আমতলীর এক দরিদ্র পরিবারে। শৈশবেই মায়ের মৃত্যুর কারণে তাঁকে পিরোজপুরে এক মাসীর বাড়িতে প্রতিপালিত হতে হয়। দেশভাগের টালমাটাল সময়ে, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে, তিনি মাসী ও যুবাবয়সী মাসতুতো ভাইয়ের সঙ্গে সামান্য পুঁজি নিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে কলকাতায় চলে আসেন।

কলকাতায় এসে প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও তিনি নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। প্রথমে ভবানীপুর সাউথ সাবার্বাণ স্কুলে এবং পরে শ্যামাপ্রসাদ সান্ধ্য কলেজে স্নাতক হন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন। তাঁর এই সংগ্রামী শিক্ষাজীবন তাঁর পরবর্তী সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

প্রধান কর্মজীবন ও অবদান

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি প্রথমে চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারী হিসাবে এক বীমা কোম্পানিতে যোগ দেন। তবে এই সময়ের অবসরকালে তিনি টিউশন করতেন এবং নিজে পড়াশোনা করতেন। কর্মজীবনের প্রথম দিকে কিছুদিন চেতলা বয়েজ স্কুলে শিক্ষকতাও করেন। এরপর তিনি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

বাভবানীপুর সাউথ সাবার্বান স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর কবিতা রচনার শুরু। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো কবিতা বিষয়ক পত্রিকা ‘কবিপত্র’ প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য পিপাসু কবিবন্ধুদের সহায়তায় তিনি এটি প্রকাশ করেন এবং দীর্ঘ ৬২ বছর ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে এর সম্পাদনা করেন।

মহাকাব্যের স্রষ্টা ✨

কবি সাতটি দীর্ঘ কবিতা ও একটি আধুনিক মহাকাব্য রচনার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর ‘শবযাত্রা’ ও ‘ইবলিশের আত্মদর্শন’ দীর্ঘ কবিতার অনবদ্য নিদর্শন, যা তাঁর সাহিত্য সম্ভারকে ‘জীবনবেদ’ হিসাবে পরিচিত করে তুলেছে।

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থসমূহ 📚

  • শবযাত্রা (১৯৬১)
  • হেমন্তের সনেট (১৯৬১)
  • আগুনের বাসিন্দা (১৯৬৭)
  • ইবলিশের আত্মদর্শন (১৯৬৯)
  • অস্তিত্ব অনস্তিত্ব সংক্রান্ত (১৯৭০)
  • বিযুক্তির স্বেদরাজ (১৯৭২)
  • শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭৬)
  • দ্রোহহীন আমার দিনগুলি (১৯৮২)
  • অলকের উপখ্যান (১৯৮২)
  • পশুপক্ষী সিরিজ (১৯৮২)
  • ভারবাহীদের গান (১৯৮৩)
  • আমি তোমাদের সঙ্গে আছি (১৯৮৫)
  • আছি প্রেমে বিপ্লবে বিষাদে (১৯৮৭)

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

পবিত্র মুখোপাধ্যায় এমন এক কবি, যিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখার ধারাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ কবিতাগুলি কেবল আকারের দিক থেকেই দীর্ঘ নয়, বরং তাতে জীবন, দর্শন, সমাজ এবং অস্তিত্বের গভীর জিজ্ঞাসা নিহিত রয়েছে। ‘কবিপত্র’-এর মাধ্যমে তিনি তরুণ কবিদের প্ল্যাটফর্ম দিয়েছেন এবং বাংলা কবিতার চর্চাকে দীর্ঘ সময় ধরে সচল রেখেছেন। তাঁর প্রথম কবিতার বই “দর্পণে অনেক মুখ” বহুবার পুরস্কৃত হয়েছে এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ, তিনি ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন।

উপসংহার

পবিত্র মুখোপাধ্যায় তাঁর সংগ্রামী জীবন ও সুদূরপ্রসারী সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে এক আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে, তাঁর অসাধারণ সৃষ্টি ও জীবনদর্শন আজও আমাদের মাঝে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। মহাকবিতার এই স্রষ্টা তাঁর কাজের মাধ্যমেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী হয়ে থাকবেন।

home3