
ক্ষিতিমোহন সেন (২ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ১২ মার্চ ১৯৬০) ছিলেন এক বিরলপ্রজ বাঙালি গবেষক, সংগ্রাহক এবং শিক্ষক, যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ভারতের বহুধা-বিস্তৃত সংস্কৃতি ও লোকায়ত জ্ঞানচর্চায়। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপস্থিত উপাচার্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় মধ্যযুগের ধর্মীয় বাণী, বাউল সঙ্গীত এবং সাধনতত্ত্বের মতো বিরল বিষয়গুলির সংগ্রহ ও গবেষণায় তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়।
১. প্রারম্ভিক জীবন
তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলা) সোনারং গ্রামে। তাঁর পিতা ভুবনমোহন সেন পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তাঁর দৌহিত্র (নাতির ঘরের নাতি)।
ক্ষিতিমোহন উচ্চশিক্ষার জন্য কাশীর কুইনস কলেজ থেকে সংস্কৃতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবনে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সেই সময়ে তাঁকে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি প্রদান করা হয়।
২. কর্মজীবনের শুরু ও রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন চাম্বারাজ এস্টেটের শিক্ষাসচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী হিসেবে ভারতের বিভিন্ন স্থান এবং ১৯২৪ সালে চীন ভ্রমণ করেছিলেন, যা তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধিকে আরও প্রসারিত করেছিল।
মধ্যযুগের জ্ঞানসাধনা ✨
ক্ষিতিমোহন সেনের প্রধান কৃতিত্ব হলো মধ্যযুগের সন্তদের বাণী, বাউল সঙ্গীত এবং সাধনতত্ত্ব নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা ও সংগ্রহ। প্রায় পঞ্চাশ বছরের নিরলস চেষ্টায় সংগৃহীত এই অমূল্য সম্পদ তিনি বিভিন্ন বইতে প্রকাশ করেছেন। তাঁর সংগ্রহ অবলম্বনেই রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘One Hundred Poems of Kabir’ (১৯১৪) বইটি রচিত।
৩. গবেষণা ও সাহিত্যিক অবদান
তিনি শুধু মধ্যযুগের সাধনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বেদ, উপনিষদ, তন্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র, সঙ্গীতশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি সংস্কৃত, বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও **গুজরাতি, রাজস্থানি, আরবি ও ফারসি ভাষায়** সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন।
🌐 আন্তর্জাতিক পরিচিতি
তাঁর রচিত Hinduism বইটি ফরাসি, জার্মান এবং ডাচ ভাষায় অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমাদৃত হয়েছিল। এছাড়াও তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থ হিন্দি, গুজরাটি এবং অসমীয়া ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি একজন সুবক্তা ও অপেশাদার অভিনেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লীলা বক্তব্য প্রদান করেন।
৪. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও সম্মাননা
📚 গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ
- কবীর (১৯১১)
- ভারতীয় মধ্যযুগের সাধনার ধারা (১৯৩০)
- ভারতের সংস্কৃতি (১৯৪৩)
- বাংলার সাধনা (১৯৪৫)
- যুগগুরু রামমোহন (১৯৪৫)
- বাংলার বাউল (১৯৪৭)
- হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ (১৯৪৭)
- প্রাচীন ভারতে নারী (১৯৫০)
- Medieval Mysticism of India (১৯৩৬)
🏆 প্রধান সম্মাননা
- বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্র-স্মৃতি স্বর্ণপদক ও প্রথম দেশিকোত্তম উপাধি।
- ওয়ার্ধার হিন্দি ভাষা প্রচার সমিতি থেকে মহাত্মা গান্ধী পুরস্কার।
- প্রয়াগের হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন থেকে মুরারকা পুরস্কার।
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক।
