Bangla Panjika 2026

মদনমোহন মালব্য: শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও জাতীয় নেতা

ভারতের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম (২৫ ডিসেম্বর ১৮৬১ – ১২ নভেম্বর ১৯৪৬) মদনমোহন মালব্য। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজসংস্কারক ও সাংবাদিক। দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও জাতীয় চেতনার মেলবন্ধনে তিনি ভারতীয় সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তার প্রজ্ঞা, সহৃদয়তা ও সমাজসেবার মানসিকতার জন্যই মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে “মহামনা” নামে অভিহিত করে।

মদনমোহন মালব্য এক গৌড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম পণ্ডিত ব্রিজনাথ এবং মাতার নাম মুনা দেবী। শৈশবে তিনি প্রথমে স্থানীয় সংস্কৃত পাঠশালায় এবং পরে ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

স্কুল জীবনে তিনি ‘মকরন্দ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। পরবর্তীতে তিনি মুয়ার সেন্ট্রাল কলেজ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তিনি সংস্কৃত স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে পারেননি এবং ১৮৮৪ সালে এলাহাবাদ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

ভারতের উচ্চশিক্ষা ও জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে মদনমোহন মালব্যের অবদান অপরিসীম। তারই উদ্যোগে বারাণসীতে প্রতিষ্ঠিত হয় কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় (Banaras Hindu University – BHU), যা আজ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি জাতীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চার বারের সভাপতি হিসেবে মদনমোহন মালব্য জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন নরমপন্থী নেতা, যিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি লখনউ চুক্তিতে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন এবং সর্বদা সাম্প্রদায়িক ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। চৌরিচৌরা ঘটনার পর শতাধিক স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রাণ বাঁচাতে তার আইনজীবীসুলভ প্রজ্ঞা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ। হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় একাধিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচার করেন। তার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দ্য লিডার’‘হিন্দুস্তান টাইমস’— যা ভারতীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মদনমোহন মালব্য ছিলেন অগ্রগামী। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মর্যাদা ধর্ম বা বর্ণের উপর নির্ভর করে না, বরং তার মানবিকতার উপর নির্ভরশীল। সমাজে হিন্দুদের মধ্যে বর্ণভেদ দূর করতে এবং সকলের জন্য মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত করতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেন।

সত্যমেব জয়তে”— এই মন্ত্রটি ভারতীয় জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল তারই উদ্যোগে। আজও তার প্রতিষ্ঠিত কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, ও প্রতিষ্ঠান তার নাম ধারণ করে চলেছে।
মদনমোহন মালব্যের জীবন ছিল এক নিবেদিত যাত্রা— শিক্ষার আলো, সমাজকল্যাণ ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি এক অক্লান্ত সাধনা। তার আদর্শ আজও আমাদের পথ দেখায়।

home3