
স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১০ নভেম্বর, ১৮৪৮ – ৬ আগস্ট, ১৯২৫) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম যুগের অন্যতম বিশিষ্ট নেতা। তিনি ঊনবিংশ শতকের রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল কনফারেন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সক্রিয় নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশবাসীর কাছে তিনি “রাষ্ট্রগুরু” নামেই পরিচিত হন।
পারিবারিক জীবন
কলকাতায় এক সুধী ও শিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই সময়ের খ্যাতনামা চিকিৎসক। পরিবার থেকেই তিনি শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রেরণা পান।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের সূচনা
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে সুরেন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে গিয়ে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে সিলেটে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ শুরু করলেও প্রশাসনিক কারণে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এই ঘটনার পর তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান, জাতীয় নেতৃত্বে আরও গভীরভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে। তিনি সেখানে বিভিন্ন বক্তৃতা, লেখা ও আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয় চেতনার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং আত্মনির্ভরতার বার্তা প্রচার করেন।
১৮৭৫ সালে তিনি মাতৃভূমি ভারতে ফিরে এসে শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে প্রথমে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, পরে ফ্রি চার্চ কলেজ এবং শেষে রিপন কলেজে যোগ দেন। পরবর্তীতে এই কলেজই তাঁর নামে পরিচিত হয় সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হিসেবে।
রাজনৈতিক জীবন
দেশের সর্বভারতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে তিনি ১৮৭৬ সালে ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে দি বেঙ্গলি নামে একটি সংবাদপত্র সম্পাদনা করে জাতীয় চেতনা, স্বাধীনতা ও একতার প্রচারে নির্ভীক ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দুইবার সভাপতি নির্বাচিত হন (১৮৯৫ ও ১৯০২ সালে) এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেয়।
পরবর্তী সময়ে মতপার্থক্যের কারণে কংগ্রেস থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পক্ষে কাজ করেন এবং তৎকালীন বাংলার সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দেশপ্রেম ও সহনশীল নেতৃত্ব তাঁকে জাতীয় রাজনীতির এক উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করে।
সমাজসংস্কারে অবদান
শিক্ষক ও চিন্তাবিদ হিসেবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তরুণ সমাজকে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আত্মসম্মানের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা ও সামাজিক পুনর্জাগরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নেন।
রাজা রামমোহন রায়ের দেখানো সমাজসংস্কারের পথে তিনি নতুন প্রেরণা সঞ্চার করেন, যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁর কিছু প্রচেষ্টা পূর্ণ সাফল্য পায়নি।
উত্তরাধিকার
রাষ্ট্রগুরু স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আজও স্মরণীয় — একজন আদর্শ শিক্ষক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক ও সমাজসংস্কারক হিসেবে। তাঁর জীবনপ্রবাহ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম যুগের সংগ্রাম ও জাগরণের প্রতীক হয়ে আছে।
