Bangla Panjika 2026

কানাইলাল দত্ত: ফাঁসির মঞ্চে যাঁর ওজন বেড়েছিল ১৬ পাউন্ড

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেক বিপ্লবী রয়েছেন, যাঁদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। এমনই একজন কিংবদন্তী বিপ্লবী হলেন কানাইলাল দত্ত। মাত্র ২০ বছর বয়সে যিনি ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে জেলের ভেতরেই এক বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করেছিলেন এবং নির্ভীক চিত্তে ফাঁসির মঞ্চে জীবন উৎসর্গ করেন।

বিষয়তথ্য
নামকানাইলাল দত্ত
জন্ম৩১ আগস্ট, ১৮৮৮ 
জন্মস্থানচন্দননগর, হুগলি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু১০ নভেম্বর, ১৯০৮ (বয়স ২০) 
মৃত্যুর কারণফাঁসি
পরিচিতিভারতীয় বিপ্লবী, অগ্নিযুগের শহীদ
সংগঠনঅনুশীলন সমিতি
উল্লেখযোগ্য কাজআলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে হত্যা 
কানাইলাল দত্তের জন্মস্থান, চন্দননগর, হুগলি

কানাইলাল দত্ত ১৮৮৮ সালের ৩১ আগস্ট জন্মাষ্টমীর পুণ্য তিথিতে চন্দননগরে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবা চুনীলাল দত্ত এবং মা ব্রজেশ্বরী দেবী। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশবের কিছু অংশ বোম্বাইতে কাটলেও, পরে তিনি চন্দননগরের ডুপ্লে বিদ্যামন্দিরে (যা বর্তমানে কানাইলাল বিদ্যামন্দির নামে পরিচিত) ভর্তি হন ।

কানাইলালের বিপ্লবী জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল ডুপ্লে কলেজের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র রায়ের কাছে। তাঁর কাছেই তিনি বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হন এবং অস্ত্র চালনা শেখেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর মতো ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসেন এবং নিজের চেষ্টায় চন্দননগরে একাধিক বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন ।

১৯০৮ সালে কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টার পর পুলিশি ধরপাকড় শুরু হলে, কানাইলাল দত্তকেও ২ মে কলকাতার ১৫ নম্বর গোপীমোহন দত্ত লেন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটিই ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত ।

নরেন গোঁসাই হত্যায় কানাইলাল-কর্তৃক ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র

এই মামলার প্রায় সমস্ত বিপ্লবী ধরা পড়লেও, দলেরই একজন সদস্য, নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাজসাক্ষী হয়ে যান। তিনি ব্রিটিশ পুলিশকে বিপ্লবীদের সমস্ত গোপন তথ্য একের পর এক ফাঁস করতে শুরু করেন। দলের সঙ্গে এই বিশ্বাসঘাতকতা কানাইলাল মেনে নিতে পারেননি। তিনি জেলের ভেতরেই নরেন গোঁসাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন ।

অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে, আরেক বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সহযোগিতায় কানাইলাল এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনাটি কার্যকর করেন। ১৯০৮ সালের ৩১ আগস্ট, জেলের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই তাঁরা রিভলভার দিয়ে নরেন গোঁসাইকে হত্যা করেন। এই ঘটনা ব্রিটিশ সরকারকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ।

নরেন গোঁসাইকে হত্যার অপরাধে বিচারে কানাইলাল দত্তের ফাঁসির আদেশ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোর বিরোধিতা করেন। অবশেষে, ১৯০৮ সালের ১০ নভেম্বর, মাত্র ২০ বছর বয়সে, তিনি ফাঁসির দড়িতে জীবন উৎসর্গ করেন ।

কানাইলাল দত্তের মৃতদেহের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান

তাঁর ফাঁসির আগে ঘটেছিল এক অলৌকিক ঘটনা। ফাঁসির আদেশ শোনার পর কানাইলালের ওজন প্রায় ১৬ পাউন্ড (প্রায় ৭ কেজি) বেড়ে গিয়েছিল! বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “নির্বাসিতের আত্মকথা” গ্রন্থে লিখেছেন:

“জীবনে অনেক সাধুসন্ন্যাসী দেখিয়াছি; কানাইএর মত অমন প্রশান্ত মুখচ্ছবি আর বড় একটা দেখি নাই। সে মুখে চিন্তার রেখা নাই, বিষাদের ছায়া নাই, চাঞ্চল্যের লেশ মাত্র নাই… ফাঁসির আদেশ শুনিবার পর তাহার ওজন ১৬ পাউণ্ড বাড়িয়া গিয়াছে!!”

ফাঁসির সময় তাঁর নির্ভীক, শান্ত ও হাস্যময় মুখ দেখে জেলের ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম বসুর পর কানাইলাল দত্ত ছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবী, যাঁর আত্মবলিদান সমগ্র জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের আগুনকে নতুন করে প্রজ্বলিত করেছিল ।

home3