
শৈশব ও গানের শুরু
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম কোটলা সুলতান সিং-এ জন্ম নেন মোহাম্মদ রফি এবং তিনি ১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শৈশবে গ্রামের পথে ফকিরদের গান শুনে গান শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মে। ছোট থেকেই গানে বিশেষ প্রতিভা দেখান; পরিবার লাহোরে চলে গেলে সেখানেই সঙ্গীতচর্চা শুরু করেন।
পরিবারের উৎসাহ এবং বড় ভাইয়ের বন্ধু আবদুল হামিদের সহযোগিতায় রফি পাড়ি দেন বম্বে (আজকের মুম্বাই); শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান ও আরও বিশিষ্ট গুরুর কাছে।
বলিউডে অভিষেক ও নতুন যুগের সূচনা
মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে ‘গাঁও কি গৌরী’ ছবিতে প্রথম হিন্দি গান রেকর্ড করেন রফি। দেশভাগ ও স্বাধীনতার পর পরিবর্তিত সমাজে রফির কণ্ঠ দ্রুত পরিচিতি পেতে থাকে। গান্ধীজির মৃত্যুতে গাওয়া ‘শুনো শুনো এই দুনিয়াওয়ালো’ সারা দেশকে আলোড়িত করে। তখন থেকেই বলিউডের প্লেব্যাক ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর উত্থান শুরু।
অসাধারণ গায়কী ও কালজয়ী গান
রফি এমন একজন শিল্পী, যিনি রোমান্টিক গান, ভক্তিমূলক, দেশাত্মবোধক, কাওয়ালি, গজল—সব ঘরানায় সমান দক্ষ। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- “ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে”
- “মন তারপাতে হর দারশন কো আজ”
- “চাহুঙ্গা মে তুঝে সন্ধ্যা সকারে”
- “বাহারো ফুল বারসাও”
- “ইয়েহ দুনিয়া ইয়ে মেহফিল”
সুরকারের পছন্দের শিল্পী
নওশাদ, শংকর-জয়কিশন, সি. রামচন্দ্র, এস. ডি. বর্মন, লক্ষ্মীকান্ত-প্যায়ারেলাল, পঞ্চম দা—সব সুরকারেরই তিনি প্রথম পছন্দের কণ্ঠশিল্পী। বিভিন্ন সুরকারের সঙ্গে তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গান এমনঃ
| সুরকার | মোট গান | বিখ্যাত গান |
|---|---|---|
| নওশাদ | ১৪৯ | ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে, মন তারপাত |
| শংকর-জয়কিশন | ৩৭৩ | এহসান তেরা হোগা, দিল কে ঝরখে |
| লক্ষ্মীকান্ত-প্যায়ারেলাল | ৩৬৯ | চাহুঙ্গা মে তুঝে, দিল পুকারে |

ভাষার বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিকতা
রফি শুধু হিন্দি নয়, আরও ২০টির বেশি ভারতীয় ভাষায় প্লেব্যাক করেছেন—বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবী, মারাঠি, গুজরাতি, তেলেগু, ওড়িয়া ইত্যাদিতে। তাঁর গাওয়া কিছু ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ গানও আছে।
গানের সংখ্যা ও রেকর্ড
কত গান রেকর্ড করেছেন, এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গড় হিসেব ৭ হাজার থেকে ২৬ হাজারের মতো। অনেকে তাঁকে গিনেস বুকেও দাবি করেছেন সর্বাধিক সংগীত রেকর্ডধারী হিসেবে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
- ফিল্মফেয়ার পুরস্কার: ৬ বার
- পদ্মশ্রী: ১৯৬৭ সালে
- রফির স্মরণে ১৯৮০ সালে তার মৃত্যুর পর মুম্বাই শহরে বৃহত্তম জনসমাবেশে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যক্তিত্ব ও শিল্পী জীবন
রফি খুবই নম্র ও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। বলিউডের ব্যস্ততম সময়েও নবীন শিল্পীদের সাহায্য করতেন। দরিদ্রদের সাহায্য করার পিছনে ছিলেন নিঃস্বার্থ।
মৃত্যুর মূর্হূত
১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মুম্বাইয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হলো, কিন্তু রেখে গেলেন ‘সময়ের বাইরে’-এর মতো অসংখ্য জীবন্ত গান।
কেন মোহাম্মদ রফি আজও চিরজীবন্ত
- বহু ঘরানায় অসাধারণ দক্ষতা—সব ধরনের আবেগ গানে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।
- তাঁর কণ্ঠের নমনীয়তা ও উজ্জ্বলতা আজও পথপ্রদর্শক।
- পুরাতন থেকে নতুন প্রজন্ম—সবাই তাঁর গানে মুগ্ধ।
- আজও রিমিক্স, ফিল্ম ও বিজ্ঞাপনে তার গান ব্যবহৃত হচ্ছে।
রফির গান বাজলেই হৃদয় ছুঁয়ে যায়—কারণ, তাঁর কণ্ঠ স্বাচ্ছন্দ্যে সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে আজও বয়ে চলে। বাংলা হোক বা হিন্দি, মঞ্চ হোক বা রেডিও—তাঁর সুর চিরকাল বেজে যাবে কোটি শ্রোতার মনে।
