
দেবস্নান পূর্ণিমা
প্রচণ্ড গ্রীষ্মে যখন জ্যৈষ্ঠ মাসের তাপমাত্রায় চারপাশ যেন জ্বলছে, তখনই অনুষ্ঠিত হয় দেবস্নান পূর্ণিমা, অর্থাৎ প্রভু জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা উৎসব। এই দিনে মহাপ্রভুকে ১০৮টি পবিত্র কলসজল দিয়ে স্নান করানো হয়। স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কর্তৃক কাঠের বিগ্রহ স্থাপনের সময় থেকে।
দারুব্রহ্মকে স্নান করানোর এই শুভ তিথির নামই দেবস্নান পূর্ণিমা। বৈষ্ণব সমাজের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। বিশ্বাস করা হয়, এই দিন জগন্নাথ স্বয়ং মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। শাস্ত্রে আছে, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে স্বয়ম্ভু মনুর যজ্ঞের ফলে জগন্নাথদেবের আবির্ভাব ঘটে। স্নানের পর তাঁকে গজবেশে সাজানো হয় এবং এরপর শুরু হয় ‘অনসর’ পর্যায়, যেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে গোপন স্থানে অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর দর্শনেই পাপমোচন হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
স্নানযাত্রার মাহাত্ম্য
এই পবিত্র স্নানযাত্রা একবার শ্রদ্ধা সহকারে দর্শন করলে জীবনের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। অনেক ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, এই স্নানযাত্রা দর্শন সমস্ত তীর্থে স্নানের চেয়েও বহু গুণ বেশি পূণ্যদায়ক। ঋষিদের মতে, যে ব্যক্তি নিষ্ঠাভরে এই স্নান দর্শন করে, তার আর পুনর্জন্ম হয় না। আনন্দচিত্তে স্নানযাত্রা দর্শন করলে আজন্ম পাপ বিনষ্ট হয়। অনেক স্থানে স্নানের পাশাপাশি ভোগ অর্পণ, আরতি ও হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজনও হয়।
স্নানযাত্রার রীতি
এই উৎসবের আগের সন্ধ্যায় জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও অন্যান্য বিগ্রহ গর্ভগৃহ থেকে এক বিশাল শোভাযাত্রায় বেরিয়ে স্নানমণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। মন্দির প্রাঙ্গণের বিশেষভাবে নির্মিত এই স্নানমঞ্চে বিগ্রহদের বসানো হয়। পরদিন সকালে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে কূপজল বিশুদ্ধ করে তাতে সুগন্ধি ও ভেষজ উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয় স্নানের জল। এরপর ১০৮টি ঘড়া জলে মহাপ্রভুর জলাভিষেক সম্পন্ন হয়।
সন্ধ্যাবেলায় জগন্নাথ ও বলরামকে ‘গজবেশে’ সাজানো হয়—গণেশের মতো শুঁড়যুক্ত মুখাবরণ পরিয়ে। এই রূপই গজবেশ নামে পরিচিত।
গজবেশ: এক ভক্তির গল্প
জনশ্রুতি অনুসারে, একবার কর্ণাটকের গণপতি ভট্ট নামের এক পরম গণেশভক্ত পুরী দর্শনে আসেন। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করেন, “আপনি যদি সব দেবতার প্রতিরূপ হন, তবে আমাকে আমার ইষ্টদেব গণেশের রূপ দিন।” সেই মুহূর্তেই প্রভু জগন্নাথ তাঁকে গণেশ রূপে দর্শন দেন। সেই থেকেই এই গজবেশ প্রচলন শুরু হয়। স্নানযাত্রার শেষে এই বেশই প্রথম রূপ হিসেবে পালিত হয়।
অনসর পর্যায়
বিশ্বাস করা হয়, মহাস্নানের পরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা জ্বরে আক্রান্ত হন। তখন তাঁদের গোপনে চিকিৎসা করা হয় এবং ১৫ দিন কেউ তাঁদের দর্শন করতে পারেন না। এই পর্যায়কেই বলা হয় ‘অনসর’। এই সময় মূল মন্দিরে বিগ্রহের পরিবর্তে পটচিত্র স্থাপন করা হয়। ভক্তরা অলরনাথ মন্দিরে যান, যেখানে বিশ্বাস করা হয় এই সময় জগন্নাথ অলরনাথ রূপে বিরাজমান।
নীলকণ্ঠ পাখির লোককথা
শোনা যায়, প্রতিবার স্নানযাত্রার দিন পুরী মন্দির থেকে এক নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে গিয়ে শ্রীরামপুরের মাহেশ মন্দিরের উপর দিয়ে উড়ে যায়। এই পাখির ডাক দিয়েই মাহেশে স্নানযাত্রার সূচনা হয়। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, পাখিটি না এলে উৎসব সম্পূর্ণ হয় না।
