
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সৃজনশীল নির্মাতা ও কবি ছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ — ১০ জুন ২০২১)। ১৯৪৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়ার আনারা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে সেই আগ্রহই তাঁকে বাংলা সিনেমার এক অনন্য ভাষা নির্মাণে সাহায্য করে।
তিনি শুধু চলচ্চিত্র পরিচালকই নন, একজন শক্তিশালী কবিও ছিলেন। তাঁর সিনেমায় কবিতার আবহ, নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেল দর্শকদের আলাদা অনুভূতি দিত। তাঁর অসামান্য সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অনুপ্রেরণা ও সিনেমার দর্শন 🎬
অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্রথমে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে চলচ্চিত্রকেই নিজের মূল কাজ হিসেবে বেছে নেন। কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে বিশ্ব সিনেমার নানা ধারা সম্পর্কে তাঁর গভীর ধারণা তৈরি হয়। সত্যজিৎ রায়, আকিরা কুরোসাওয়া, ইঙ্গমার বার্গম্যানসহ বহু কিংবদন্তি পরিচালকের কাজ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ও কালজয়ী সৃষ্টি
১৯৭৮ সালে “দূরত্ব” ছবির মাধ্যমে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক ভিন্নধর্মী সিনেমা নির্মাণ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মান অর্জন করেন। তাঁর পরিচালিত কয়েকটি অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র নিচে দেওয়া হলো—
- বাঘ বাহাদুর
- তাহারদের কথা
- চারাচর
- উত্তরা
- লাল দরজা
- কালপুরুষ
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তাঁর ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলীর জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত প্রশংসিত হন। “উত্তরা” ছবির জন্য তিনি বিশ্বখ্যাত ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সিলভার লায়ন’ (শ্রেষ্ঠ পরিচালক) সম্মান পান। এছাড়াও তিনি কর্মজীবনে একাধিকবার ভারতের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে (National Film Award) সম্মানিত হন।
সাহিত্যে অবদান ও কাব্যগ্রন্থ
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলা কবিতাতেও তাঁর একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী পরিচয় ছিল। চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু কাব্যগ্রন্থ পাঠকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পায়, যার মধ্যে অন্যতম—
- কফিন কিংবা সুটকেস
- ছাতা কাহিনি
- রোবটের গান
মহাপ্রস্থান
২০২১ সালের ১০ জুন দক্ষিণ কলকাতার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বরেণ্য নির্মাতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে না থাকলেও, বাংলা সিনেমা ও সাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদান আজও সমানভাবে স্মরণীয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
